Friday, September 4, 2015

হানিমুন - গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন



আমি এর আগে দুবার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন গেছি - একবার ২০০৯ সালে, আর একবার ২০১৩ সালে। ক্যানিয়ন-এর দক্ষিন কানায় অর্থাৎ South rim-এর ওপর ৭০০০ ফুট উচ্চতায় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ভিলেজ। লাস ভেগাস থেকে মরুভূমি আর কিছুটা পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ২৭৩ মাইল গাড়ি চালিয়ে এখানে আসতে ঘন্টা পাঁচেক লেগে যায়। তার মধ্যে অবশ্য একবার থেমে কফি আর বার্গার খাওয়া হয়েছিল। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে থাকার জায়গা কম, কয়েক মাস আগে থেকে বুক না করলে সে থাকার জায়গায় ঘর পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কম। জুন মাসে আমি যখন এই বেড়ানোটা প্ল্যান করছিলাম তখন গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন-এর ভেতর একটা মাত্র লজে একটা মাত্র রাতের জন্য ঘর খালি আছে। তাই ওই "১১ই অগাস্ট য়াভাপাই লজে রাত কাটানো"- এই ব্যাপারটাকে কেন্দ্র করে আমাদের পুরো বেড়ানোর প্ল্যানটাকে গড়ে তুলতে হয়।

সৌভাগ্যবশত আমাদের আগে থেকেই ইচ্ছে ছিল একরাত অন্তত তাঁবুতে কাটাব। ১০ তারিখের ক্যাম্পগ্রাউন্ড পাওয়া গেছিল। তাই আমরা লাস ভেগাস থেকে এসে সোজা ক্যাম্পগ্রাউন্ডে গিয়ে তাঁবু খাটালাম। আসে-পাশে বেশ বড় বড় হরিন ঘুরছিল, যাদের ইংরেজিতে বলে এল্ক (Elk)। তবে এরা সবাই মেয়ে-হরিন। ছেলে এল্কদের মাথায় বিশাল বিশাল শিং থাকে, বল্গাহরিনের মতন। সেরকম একটা ২০০৯ সালে দেখেছিলাম, এবার একটাও দেখতে পেলামনা। তাঁবু খাটিয়ে গাড়িটা নিয়েই চলে গেলাম গ্রামের কেন্দ্রস্থল - মার্কেট স্কোয়ার। এখানে একটা দোকান আছে, সব কিছুর। এ ছাড়াও আছে ব্যাঙ্ক আর পোস্ট অফিস। য়াভাপাই লজ আর লজের রেস্তোরাঁটাও এখানেই। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে সব জায়গায় গাড়ি চালিয়ে ঘোরা যায়না। কিছু নির্দিষ্ট পার্কিং লটে গাড়ি রেখে ফ্রি বাস নিয়ে ঘুরতে হয়। সব রুটেই কুড়ি মিনিট অন্তর বাস চলে। আমরা মার্কেট থেকে আগুন জ্বালাবার কাঠ, কাঠে আগুন ধরাবার জ্বালানি, লাইটার (এটা আরেকটা জিনিস যেটা বাড়িতে ফেলে এসেছিলাম), কলা, পাঁউরুটি ইত্যাদি কিনে গাড়িতে রাখলাম। তারপর গাড়িটাকে ওখানে রেখেই বাস ধরে সূর্যাস্ত দেখতে চলে গেলাম ম্যাথার পয়েন্টে।

গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত এর আগেও দেখেছি। এ জিনিস কখনও পুরনো হয়না। আকাশে সূর্য যদি নাও দেখা যায়, যদি মেঘ বা পাহাড়ের আড়ালে চাপা পড়ে, তাহলেও গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মধ্যে লালচে পাহাড়গুলোর ওপর সোনালী আলোর খেলা দেখা যায়। আজকে আমরা যে পয়েন্টটায় এসেছিলাম সেটা সূর্যাস্ত দেখার আদর্শ জায়গা নয়, কারণ পশ্চিমদিকে সূর্যটা পাহাড়ের আড়ালে ডুবলো। কিন্তু ডোবার সময়ে সামনের পাথরে যে রংটা দেখলাম সেটা চোখে না দেখে শুধু ছবিতে দেখলে, মনে হতেই পারে ফটোশপে রং করা।

সূর্য ডোবার পর আমরা আবার মার্কেট স্কোয়ারে ফিরে এসে রেস্তোরাঁতে ডিনার করলাম। তারপর নিকষ অন্ধকারের মধ্যে ঝিঁঝিঁ ডাকা বনের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আমাদের ক্যাম্পগ্রাউন্ডে ফিরে এলাম। দোকানের কাঠটা খুব একটা ভালো ছিলনা, তাই বাকি সন্ধ্যেটা ক্যাম্পফায়ারটার সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটল। রাতে শুতে যাওয়ার আগে গাছের ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বহু বছরের মধ্যে প্রথমবার ছায়াপথটা দেখতে পেলাম।



পরদিন ভোর রাতে উঠে অন্ধকারের মধ্যে ঠান্ডায় হি হি করতে করতে সূর্যোদয় দেখতে যাওয়া হল। ওঠার সময়ে সূর্য মেঘের আড়ালে ছিল, তাই আমরা গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মধ্যে আলোর খেলা দেখেই ফিরে এলাম। ক্যাম্পসাইটে ফিরে তাঁবু গুটোতে গুটোতেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি নামল, আমরা কোনওমতে তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ ইত্যাদি সব গাড়িতে তুলে চেক-আউট করে মার্কেট স্কোয়ারে গাড়ি পার্ক করলাম। ততক্ষণে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে গেছে, আকাশের মুখ ভার। আমরা দোকানের বারান্দায় আশ্রয় নিয়ে ভাবতে লাগলাম কি করা উচিত। আমাদের দুপুর অবধি হাইকিং-এর প্ল্যানটা কি তাহলে মাঠে মারা যাবে? দোকানটায় সাড়ে আট ডলার করে "রেন পঞ্চো" বিক্রি হচ্ছে বটে, কিন্তু সেটাকে বর্ষাতি না বলে বড় পলিথিনের প্যাকেট বলাই ঠিক। এর মধ্যে একটাই ভাল ব্যাপার হল, ওই দোকানের বারান্দায় বসে আমরা অল্প কিছুক্ষণের জন্য সেলফোনের সিগনাল পেলাম, যেটা কাল থেকে পাওয়া যায়নি। বাড়িতে কথা বলা হল, মায়ের জন্মদিন ছিল সেদিন, হ্যাপি বার্থডে-ও জানানো হল। তারপর বসে বসে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করতে লাগলাম।

প্রায় ঘন্টাখানেক পর মনে হল আকাশটা সামান্য ফর্সা হল। বৃষ্টিটা ধরে যেতেই আমরাও বাস ধরে চলে গেলাম সাউথ কাইবাব হাইকিং ট্রেলের মুখে। আমাদের ড্রাইভার বার বার সাবধান করে দিয়েছিলেন যেন যথেষ্ট পরিমান জল নিই, কারণ ট্রেলে জল পাওয়া যায়না আর এক মাইল নিচে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের তলাটা ওপরের থেকে অন্তত ১৫ ডিগ্রী বেশি গরম। তাছাড়া এটাও মাথায় রাখতে বললেন যে যতটা নামতে এক ঘন্টা লাগে, ততটা উঠতে দু ঘন্টা লাগে। আমাদের অবশ্য এক মাইল গভীরে নামার কোনও ইচ্ছে ছিলনা। আমরা প্রায় এক মাইল হেঁটে ৬০০ ফুট নেমে "উঃ আঃ পয়েন্ট" (Ooh Aah Point) অবধি গিয়ে আবার ফিরে আসব সেরকম প্ল্যান ছিল। কিন্তু বাস থেকে নেমে ক্যানিয়নের ধারে গিয়ে আমাদের কথা বন্ধ হয়ে গেল।

দেখলাম আমার দুবার দেখা অতি পরিচিত গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন আর পরিচিত নেই। এই কয়েক ঘন্টা আগেও যখন সূর্যোদয় দেখে গেছি তখনও ন্যাড়া লাল পাথর দেখেছি খাদের মধ্যে, যতদুর দৃষ্টি যায় ততদূর। আর এখন খাদের মধ্যেটা দেখাই যাচ্ছেনা, কারণ ক্যানিয়নটা কুন্ডলী পাকানো সাদা মেঘে ভরে গেছে। মেঘের মধ্যে থেকে মাথা তুলে রয়েছে মাঝের পাহাড়গুলো আর ক্যানিয়নের ধারগুলো, যেরকম একটা ধারে আমরা দাঁড়িয়ে। এরোপ্লেন থেকে ছাড়া, নিচের দিকে তাকিয়ে মেঘ দেখার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। ভেবে দেখলে ব্যাপারটা হয়ত তেমন আশ্চর্য নয়। দার্জিলিঙে ঘরে মেঘ ঢুকে পড়ে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়া হয়, এসবই পড়েছি উপেন্দ্রকিশোরের লেখায়। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের দক্ষিন ধারের উচ্চতা দার্জিলিঙের সমান, তাই মেঘের আনাগোনা থাকতেই পারে। কিন্তু জায়গাটা প্রায় মরুভূমির মতন শুকনো আর ন্যাড়া বলে মেঘ-বৃষ্টি বিশেষ দেখা যায়না। সেজন্যই গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের এই দার্জিলিং-রূপ এত অচেনা আর বিরল।

আমরা আর সময় নষ্ট না করে নামা শুরু করলাম।


নামার রাস্তাটা যে খুব কষ্টকর তা বলবনা, তবে জায়গায় জায়গায় বেশ খাড়াই। প্রথম দিকে অনেক লোকজন চোখে পড়লেও আস্তে আস্তে লোকজন কমে এল। এমনিতে অন্য সময়েই এই রাস্তার প্রতিটি বাঁক ঘুরলেই নতুন দৃশ্য চোখে পড়ে, আজ মেঘের জন্য সেগুলো অনেক বেশি সুন্দর হয়ে উঠল। এই একটা পাহাড় দেখা যায়, তো পরমুহুর্তেই সেটা ভ্যানিশ। সামনে একটু নিচে দেখছি মেঘ, আবার মেঘের ফাঁক দিয়ে অনেক নিচে মাটির ওপর দেখছি রোদ্দুর। উঃ আঃ পয়েন্টে পৌঁছে চারিদিকের দৃশ্য দেখে উঃ, আঃ, ওয়াও ইত্যাদি বললাম, ছবি-টবি তোলা হল। এখানে বেশ কিছু মানুষ জটলা করে ছিলেন, তাঁদের দিয়ে আমাদের দুজনকার ছবিও তোলানো গেল, যদিও আমাদের সঙ্গে সেল্ফি স্টিক-ও ছিল। তারপর ফেরার পালা।


ফেরাটা কিন্তু অত সহজ হলনা। কয়েক পা উঠতে না উঠতেই হাঁটু দুটো ধরে গেল, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল আর আমরা দুজনেই ডাঙায় তোলা মাছের মতন হাঁ করে খাবি খেতে লাগলাম। শেষে পথের ধারে একটা পাথরের ওপর ধপাস করে বসে পড়ে পৌলমীকে বললাম, "ট্রেল মিক্সটা বের করা যাক।"

ট্রেল মিক্স জিনিসটা কিছুই না, বিভিন্ন রকম হাই ক্যালরি খাবারের একটা মিশ্রন। মানে মুড়ি মাখায় যদি মুড়ি-চানাচুরের বদলে নানারকম বাদাম, শুকনো ফল, চকলেট চিপস এইসব থাকে তাহলে যা হয়। এ দেশে যারা নিয়মিত হাইকিং করে তারা এ জিনিসটা সঙ্গে রাখে। আমরাও নোনতা আর মিষ্টি দু রকমের মিক্স কিনে এনেছিলাম। চকলেট চিপ দেওয়াটা আনিনি, কারণ গরমের জায়গায় সেগুলো গলে চটচটে হয়ে যায়। আমাদের মিষ্টি মিক্সটায় নানারকমের ফল কিসমিসের মতন শুকিয়ে মেশানো ছিল। আমরা দুজনেই সেটা কয়েক মুঠো করে খেলাম। তার ফল হল - সত্যি বলছি - অ্যাস্টেরিক্সের জাদু পানীয় খাওয়ার মতন। উঠে দাঁড়িয়ে সেই যে হাঁটা শুরু করলাম, সেটা থামালাম এক্কেবারে ওপরে ফিরে এসে। পথে একবার মেঘের মধ্যে ঢোকার অভিজ্ঞতাও হল।



ওপরে উঠে এসে পরের বাসটা ধরে আমরা আরেকটা পয়েন্ট দেখতে গেলাম। সেখানে একটু বিপদে পড়েছিলাম। বাস তো আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেল, পরের বাস আসতে ২০ মিনিট দেরী। ইতিমধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি নামল, সেই সঙ্গে বাজ পড়া শুরু হল কাছাকাছির মধ্যেই। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ধারে মাথায় বাজ পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি, ছাতা খোলা বা গাছের তলায় আশ্রয় নেওয়া বারণ। আমরা জনা কুড়ি মানুষ বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে কাকভেজা ভিজতে লাগলাম, আর বিদ্যুতের ঝলকানি আর বাজ পড়ার শব্দের মধ্যে কত সেকেন্ড কাটে সেটা গুনে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম পরের বাজটা মাথায় পড়ার ভয় কতটা। শেষে একটা বাস এল, আমরা তাতে উঠে আশ্রয় নিলাম। বেশি লোক হয়ে যাওয়ায় সে বাসটা অবশ্য ছাড়লনা, তার পরের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু আমরা যে মাথা গোঁজবার একটা জায়গা পেয়েছিলাম সেটাই যথেষ্ট। যারা আমাদের পরে হাইকিং করতে গেছিল তারা বেশ অসুবিধায় পড়েছে বোঝা গেল।

মার্কেট স্কোয়ারে ফিরলাম যখন, তখন প্রায় দুটো বাজে। তিনটেয় আমাদের য়াভাপাই লজে চেক-ইন করার কথা। আমরা লাঞ্চে একটা পিজা কিনে অর্ধেকটা খেলাম, বাকি অর্ধেকটা রাতের জন্য নিয়ে লজে ঢুকে গেলাম। য়াভাপাই লজের ঘরগুলো বনের মধ্যে আলাদা-আলাদা বাড়িতে, আমরা গাড়িটা নিয়ে গিয়ে আমাদের বাড়িটার সামনে রাখলাম। তারপর ভিজে জামাকাপড় পাল্টে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। তখনও বৃষ্টি হয়ে চলেছে।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যখন ঘুম ভাঙল তখন দিব্যি রোদ উঠে গেছে। আমরা আবার সাজুগুজু করে সূর্যাস্ত দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। আজ হাতে সময় ছিল, তাই একটু দূরে হোপি পয়েন্টে গেলাম ভাল করে সূর্যাস্ত দেখব বলে। সূর্যাস্ত তো ভাল হলই, তার ওপর ক্যানিয়নের ভেতর কিছু মেঘ তখনও থেকে গিয়েছিল, তার ওপর আলো পড়ে অদ্ভুত নতুন রকমের এক দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হল।



গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে  আমাদের আর করার বিশেষ কিছু ছিলনা। পরদিন সকালে আবার সূর্যোদয় দেখব বলে উঠেছিলাম, কিন্তু বৃষ্টির জন্য আর বেরোতে পারিনি। তখন আরেক প্রস্থ ঘুমিয়ে উঠে নটা নাগাদ আমরা মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে গাড়িতে তুলে বেরিয়ে পড়লাম।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ১৩২ মাইল দূরে পেজ (Page) নামে আরিজোনার একটা ছোট্ট শহর।


2 comments:

Kuntala said...

bah, chhobi golpo dutoi sundor hoyechhe.

Joy Forever said...

@কুন্তলা:ধন্যবাদ। পরের পর্বটা শেষ করার সময় পাচ্ছিনা।