Thursday, July 23, 2015

শেনানডোয়া - ২

প্রথম পর্বের পর...


সকালে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। একে তো ক্লান্ত ছিলাম, তার ওপর ঠিক কটায় কোনদিকে কতদুরে গেলে সূর্যোদয় দেখা যাবে সেটা জানতামনা। ফোন তো আগের দিন পার্কে ঢোকার পর থেকেই অচল। আকাশে মেঘও দেখলাম অল্পস্বল্প। এত অজুহাত থাকলে আর সূর্যোদয় দেখতে যাওয়া চলেনা, তাই আবার পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম। সাতটা নাগাদ উঠে ক্যাম্পগ্রাউন্ডের বাথরুমে মুখ ধুয়ে চায়ের সন্ধানে বেরোলাম। আবার আগুন জ্বালানো যেত, কিন্তু অত হাঙ্গামা করার মানে হয়না। এমনিতেও আমরা সকালটা একটু ঘুরে দেখব, আর ১২টার মধ্যে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে।

ক্যাম্প থেকে মাইল দেড়েক দুরে ভিসিটর'স সেন্টার, যেখানে কাল থেমেছিলাম। তারই লাগোয়া একটা রেস্তরাঁ আছে। সেখানে গিয়ে দেখলাম দরজা বন্ধ, আটটায় খুলবে। তখনও আটটা বাজেনি, তাই আমরা গাড়ি থেকে বরফ ঠান্ডা ভুট্টা পোড়ানো বের করে খেলাম, আর আলোচনা করতে লাগলাম এই ঠান্ডা খাবারের বিকল্প হিসেবে বাইরে খাবার কিনে খাওয়া ছাড়া আর কি কি উপায় করা সম্ভব। ইতিমধ্যে দোকানটা খুলে গেল, আমরাও দু কাপ গরম কফি নিয়ে এসে বাইরে বেঞ্চিতে বসে খেলাম। সঙ্গে ঠান্ডা সবজি আর চিকেনের রোস্ট। আশ্চর্যের ব্যাপার, তখনও আমাদের থার্মোকলের বাক্সে কিছুটা বরফ রয়েছে। খাওয়ার পর একটা স্যুভেনির কিনলাম। "I saw a bear" লেখা ভালুক আঁকা জিনিসটা কিনলে মিথ্যে কথা বলা হয়, তাই সেটা বাদ। হরিন আমরা দেখেছি, ছোট ছোট প্লাস্টিকের হরিন পাওয়াও যাচ্ছিল, কিন্তু সেটা কিনতে ঠিক ইচ্ছে করলনা। হরিন তো এদেশে এই শহরের মধ্যে আমার বাড়ি থেকে পঞ্চাশ পা হাঁটলেই দেখতে পাওয়া যায়! শেষে শেনানডোয়ার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একটা প্লাস্টিকের ছোট্ট কালো ভালুক কেনা হল।

পরবর্তী গন্তব্য, ডার্ক হলো ফলস (Dark Hollow Falls)। স্কাইলাইন ড্রাইভ ধরে বিগ মেডোস থেকে একটু উত্তরে এলেই দেখা যায় রাস্তার ধারে কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সেটাই ডার্ক হলো ফলস যাওয়ার হাইকিং ট্রেলের মুখ।  নদীটাও পথের পাশে পাশে গেছে। আমরা জানতাম ফলস অবধি রাস্তাটা পৌনে এক মাইল মতন, কিন্তু সেটা কতটা নিচে নেমেছে সে সম্পর্কে কোনও ধারণা ছিলনা। আমরা ট্রেলে কিছুটা যাওয়ার পরেই দুটো জিনিস বুঝতে পারলাম। এক, রাস্তাটা বেশ দ্রুত নিচের দিকে নামছে, তাই সারাক্ষণ সন্তর্পনে পা ফেলতে হচ্ছে যাতে আলগা পাথরে পা হড়কে না যায়, আর তার ফলে পায়ে ব্যথা হচ্ছে। এই জন্যই এখানে অনেককে লাঠি হাতে হাঁটতে দেখছিলাম। দুই, আমরা ছাড়া রাস্তায় আর কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। পাখির ডাক আর জলের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনাও যাচ্ছেনা।
"ধারে গাছগুলো বড়ো বড়ো
তারা হয়ে পড়ে পড়ো - পড়ো"
"তাদের তলে তলে নিরিবিলি
নদী হেসে চলে খিলিখিলি"
প্রথম কিছুক্ষণ ব্যাপারটা নিয়ে আমরা হাসাহাসি করলেও তারপর ব্যাপারটা অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়াল। যদি এখন একটা ভালুক আসে তাহলে কি করব? ভালুক বা অন্য কোনও বন্য জন্তুর থেকে দৌড়ে পালানো বারণ সেটা জানি। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হম্বিতম্বি করলে নাকি ভালুকের পালিয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু শেনানডোয়ার ভালুকগুলো সে কথাটা জানে কিনা জানিনা। পালাতে হলেই বা কোনদিকে পালাব? নিচের দিকে ছুটতে হলে অবধারিত আছাড় খাব, আর ওপর দিকে ছোটা সম্ভবই নয়, ভালুক হেঁটে গিয়ে ধরে ফেলবে। পৌলমী হয়ত গাছে চড়তে পারবে, আমার দ্বারা সেটাও হবেনা। তাছাড়া ভালুক গাছেও চড়তে পারে। ঈসপ না কে যেন বলেছিল মাটিতে শুয়ে মড়ার ভান করলে ভালুকে ছোঁয়না। কিন্তু এদেশের ম্লেচ্ছ ভালুকদের সেসব বাছবিচার আছে বলে মনে হয়না। সবদিক ভেবে আমরা ঠিক করলাম যে আমরা কাল থেকে ভালুক দেখতে চেয়েছি বটে, কিন্তু আজ এইখানে সেই ইচ্ছেটা পূরণ না হলেই ভাল।
"পথে শিলা আছে রাশি রাশি ,
তাহা ঠেলে চলে হাসি হাসি "
অবশ্য আমরা যে পরিমান আওয়াজ করে নামছিলাম, নেহাৎ মানুষখেকো ভালুক না হলে সে যে ত্রিসীমানার মধ্যে আসবেনা সেটাও মনে হচ্ছিল। তাও আমি টেলিফটো লেন্সটা লাগিয়ে রাখলাম, যাতে দূর থেকে ভালুক দেখতে পেলেও পালাবার আগে দুয়েকটা ছবি তুলতে পারি। পৌলমী একটা মোটা মতন গাছের ডাল তুলে নিল অস্ত্র হিসেবে। আমি বললাম, "ওটা দিয়ে পেটালে কিন্তু ভালুকটা আরও রেগে যাবে।" পৌলমী বলল ও আশা করছে পেটানো অবধি গড়াবেনা ব্যাপারটা। মাঝে এক জায়গায় গাছের ফাঁক দিয়ে কালো মতন একটা কিছু নড়তে দেখে ঘাবড়ে গেছিলাম, কিন্তু তারপর দেখলাম একজন কালো জামা পরা ভদ্রলোক নিচ থেকে আসছেন। আমাদের দেখে হেসে গুড মর্নিং বলে উঠে গেলেন। ওনার ভাবগতিক দেখে মনে হলনা নিচে ভালুক দেখেছেন, তাই আমরা আরেকটু নিশ্চিন্ত মনে নামতে লাগলাম।
জলপ্রপাতের একটু আগে
নামতে নামতে যখন প্রায় আমাদের জিভ বেরিয়ে গেছে, আবার অতটা উঠতে হবে ভেবে ভয় করছে, তখন জলপ্রপাতের মাথাটা দেখা গেল। একটা সাইন বোর্ডে লেখা দেখলাম যে ফলস-এর নিচটা আর মাত্র ১০০০ ফুট দূরে। সেই ১০০০ ফুট যে কি খাড়াই সে সম্পর্কে অবশ্য বিশেষ কিছু না বলাই ভাল। তবে এখানে নিচে লোক দেখা যাচ্ছিল। শেষে আমরা যখন জলপ্রপাতের নিচে এসে দাঁড়ালাম তখন আমরা স্কাইলাইন ড্রাইভ থেকে ৪৪০ ফুট নিচে নেমে এসেছি।
"কোথাও নীচে পড়ে ঝরঝর —
পাথর কেঁপে ওঠে থরথর" 
ডার্ক হলো ফলস-এ জলের পরিমান সবসময় সমান থাকেনা। ভাগ্যক্রমে আমরা যখন গেছিলাম তখন মোটামুটি জল ছিল, কিন্তু পাথরের ওপর শ্যাওলা দেখে বুঝলাম আরও বেশি জলও থাকে অন্য সময়ে। ছোট হলেও উঁচু থেকে ধাপে ধাপে নেমে আসা ফলসটা  বেশ সুন্দর। পৌলমী জুতো-মোজা খুলে নিচে জমে থাকা জলটায় নেমে জানাল সেটা ভীষণ ঠান্ডা। রাস্তাটা ওখানে শেষ হয়নি, ঘুরে নদীর গা দিয়ে আরও  মাইল দুয়েক গেছে। আমরা আর এগোলাম না, কিছুক্ষণ ছবি-টবি তুলে আবার ফেরা শুরু করলাম। এবার ওঠার পালা - এটা আরও শক্ত। দেখলাম এবার দলে দলে লোক নামছে নিচের দিকে। প্রচুর সুইমিং কস্টিউম পরা ছেলেমেয়ে নামছে দেখলাম, নিশ্চয়ই নদীতে চান করতে যাচ্ছে। বয়স্ক মানুষদের ওঠা নামার যা গতি দেখলাম, আমাদের ভয়ানক লজ্জা করতে লাগল। এক দম্পতি - তাদের মাথাভর্তি পাকাচুল - আমাদের পরে জলপ্রপাতের কাছে নেমে আবার ফেরার পথে আমাদের ওভারটেক করে উঠে গেলেন। এদিকে রাস্তার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে আমাদের ঘেমে নেয়ে দম বেরিয়ে যাচ্ছেতাই ল্যাজে-গোবরে অবস্থা হয়ে গেল। রাস্তার কাছে পৌঁছে জঙ্গলের মধ্যে একপাল হরিন দেখতে পেয়েছিলাম, কিন্তু ছবি তোলার এনার্জি ছিলনা আর।
পাহাড়ি পথে উঠতে গিয়ে জিভ বেরিয়ে গেছে
রাস্তায় উঠে আমরা আমাদের ক্যাম্পগ্রাউন্ডে ফিরে গেলাম। এবার তাঁবু গুটিয়ে চেক-আউট করতে হবে। আমরা ধীরে সুস্থে তাঁবু গুটিয়ে সব মালপত্র গাড়িতে তুলে যখন জায়গা ছাড়লাম তখন পৌনে বারোটা বাজে। আবার আমি গাড়ি চালাচ্ছি, পৌলমীর হাতে ক্যামেরা। রাস্তার ডানদিকে একটা হরিন দেখলাম একটু পরেই, ছবিও তোলা হল। আরেকটা বড় হরিনের পাল দেখা গেল বাঁ দিকে পাহাড়ের গায়ে, সেটার ছবি তোলা গেলনা। আমাদের দুজনকার মনে একই প্রশ্ন - সেটা রবি ঠাকুরের ভাষায় বলতে গেলে, "কাছাকাছি জঙ্গলের মধ্যে একটা ভদ্রগোছের ভালুকও কি মেলে না?"
আজ ঝকঝকে রৌদ্রজ্জ্বল দিন, তাই পাহাড়ের রূপ একেবারে আলাদা। কালকের মতন পাহাড়ের ফাঁক থেকে মেঘ উঠে আসছে না আজ। কাল আমরা রাস্তার পূব দিকের একটা ওভারলুক থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখেছিলাম, তাই আজ পশ্চিম দিকে মুখ ফেরানো একটা জায়গায় দাঁড়ালাম। এদিকে পাহাড়ের সংখ্যা কম, নিচে সমতলভূমি দেখা যাচ্ছে, সেখানে চাষের ক্ষেত আর ছোট ছোট বাড়ি। আমরা জানি  ক্ষেতগুলোতে সম্ভবত ভুট্টা হয়ে আছে, কাল আমরা আসার সময়ে অনেক ভুট্টার ক্ষেত দেখেছি। নীল আকাশে শরৎকালের মতন সাদা সাদা মেঘ - সত্যি, কালকে আসার সময়ে একবারও মনেই হয়নি যে এরকম সুন্দর আবহাওয়া পাব। আমরা আবার যখন গাড়িতে উঠে রওনা হলাম, পৌলমী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"সবই হল, আর খুব ভাল ভাবেই হল। আমি বলব আমাদের প্রথম ক্যাম্পিং ট্রিপ ৯৯% সফল। শুধু একটা ভালুক যদি দেখতে পেতাম..."

"এখন গাড়িতে  খুব সাহস বেড়েছে," আমি হেসে বললাম, "একটু আগে হাইকিং ট্রেলে তো ভালুকের ভয়ে আধমরা হয়ে ছিলে।"

পৌলমী উত্তর না দিয়ে খোলা জানালা দিয়ে রাস্তার ডান দিকে মাঠে ফুটে থাকা হলুদ ফুলের ফটো তুলতে লাগল। আর ঠিক তখনই আমি জন্তুটাকে দেখতে পেলাম। মাঠ শেষ হয়ে যেখানে জঙ্গলটা রাস্তার গায়ে চলে এসেছে, একেবারে সেখানটায়। কুচকুচে কালো লোমে ঢাকা, খুব বড় অ্যালসেশিয়ান কুকুরের মাপের কি তার থেকে একটু বড়, কিন্তু আরও ভারী চেহারা। ডানদিকে রাস্তার গা ঘেঁষে মাটি থেকে ঘাসপাতা কিসব খাচ্ছে। পৌলমী তখনও দেখেনি। আমি ব্রেকে চাপ দিলাম।

"ভালুক! সামনে! ডান দিকে!"

গাড়িটা আস্তে আস্তে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালাম ভালুকটার কাছে, দশ ফুটের মধ্যে। প্রানীটা মুখ তুলে আমাদের দিকে তাকাল। 

"ছবি তোলো শিগগির।"

 "আরেকটু এগোও, এই আয়নাটা আমার সামনে আড়াল করছে।"

দেখলাম উত্তেজনার চোটে এমন ভাবে গাড়িটা দাঁড় করিয়েছি যে পৌলমীর হাতের ক্যামেরা আর ভালুকের মাঝখানে সাইড-ভিউ মিররটা পড়েছে। আবার কয়েক ফুট এগিয়ে দাঁড়ালাম। আয়নায় দেখলাম আমাদের পিছনের গাড়িটাও দাঁড়িয়ে গেছে আর গাড়ির লোকেরা একে অপরকে আঙ্গুল দিয়ে ভালুকটা দেখাচ্ছে।

ভালুক ততক্ষণে মুখ ঘুরিয়ে আবার খাওয়ায় মন দিয়েছে। পৌলমী সেই অবস্থায় কয়েকটা ছবি তুলে মুখে চুক চুক করে আওয়াজ করল, যদি ভালুক এদিক ফিরে তাকায়। সেই আওয়াজ শুনে তাকানোর কোনও চেষ্টা না করে ভালুক বাবাজি  ভয় পেয়ে সোজা দৌড়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল। আমিও আবার গাড়ি ছেড়ে দিলাম।

"ইশ, আগে যদি জানতাম ভালুক তোমার চুক চুক আওয়াজ শুনে এরকম পালায় তাহলে আজ সকালে হাইকিং করবার সময়ে এত ভয় পেতামনা।" আমি ঠাট্টার সুরে বললাম।

পৌলমী শুধু মুচকি হেসে বলল "১০০%"।

স্কাইলাইন ড্রাইভ ধরে গাড়ি এগিয়ে চলল শেনানডোয়া ন্যাশনাল পার্কের গেটের দিকে।

(সমাপ্ত)

5 comments:

Unknown said...

জলপ্রপাতের তলাটা ৪৪০ ফুট লেখাটা কি ঠিক? একটা শুন্য বা অন্য কোনো সংখ্যা বাদ গেছে কী ?
Quotation গুলো ছবির নিচে মানানসই হয়েছে। - গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

Joy Forever said...

@বাবা : হ্যাঁ ৪৪০ ফুট (চারশো চল্লিশ, আটশো আশি নয়) টা ঠিক। ওটা জলপ্রপাতটার উচ্চতা নয়, ওটা হল স্কাইলাইন ড্রাইভ থেকে জলপ্রপাতের নিচটা কতটা নিচে সেইটা। জলপ্রপাতের উচ্চতাটা অনেক কম।

Kuntala said...

Asamanyo sob chhobi aar tar songe manansoi lekha. Ei jaygatay amar jawar khub ichchhe chhilo. Apnar lekha pore manasbhromon kore elam. Asonkhyo Dhonyobad.

Joy Forever said...

@কুন্তলা : ইচ্ছে আমারও অনেকদিন ধরে ছিল, এতদিনে হল। অনেক ধন্যবাদ।

Arnab Dast said...

I seriously go to Shenandoah