Sunday, October 16, 2011

জন্মদিন

বয়সটা আর আটকে রাখা গেলনা - সেই তিরিশ ছাড়িয়েই গেল | আর হিসাব করে দেখছি এই তিরিশ বছরের মধ্যে চব্বিশ বছর, অর্থাত ৮০% সময় আমি স্কুল-কলেজে কাটিয়েছি | আরো যে কতদিন কাটাতে হবে তার ঠিক নেই |

ছোটবেলায় জন্মদিন বলতে যে স্মৃতিগুলো আছে, তার মধ্যে একটা হলো আমার পাঁচ বছরের জন্মদিন | দুমাস আগে বোন জন্মেছে, মামারবাড়িতে  ছিলাম তখন | দুপুরে সাজিয়ে গুজিয়ে প্রচুর খাওয়ানো হলো | সন্ধ্যেবেলায় বন্ধুবান্ধব এলো, প্রচুর উপহার পেলাম | তার মধ্যে বড়মামার দেওয়া বইটার কথা বিশেষ ভাবে মনে আছে | বইটাও অবশ্য আমাদের বাড়িতে আছে | ইয়াব্বড় বাঁধানো বইটার নাম Encyclopaedia of the World আর তার পাতায় পাতায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিষয়ে তথ্য | সে বইয়ের প্রথম পাতায় দু পাতা জোড়া আকাশ থেকে তোলা একটি শহরের ছবি | সামনে দুটি এক রকম দেখতে গগনচুম্বী বাড়ি, আর পিছনে আরো অনেক উঁচু উঁচু বাড়ি | নিচে জলের ধারে জেটি, নদীর ওপর ব্রিজ - সব মিলিয়ে প্রচুর খুঁটিনাটি দেখার জিনিস | আমি ঘন্টার পর ঘন্টা ওই ছবিটা দেখতাম বসে বসে | তার বহু বছর পর ওই এক রকম দেখতে বাড়ি দুটিকে ভেঙ্গে পড়তে দেখি | তখনও আমি জানতামনা ওই শহরটার পাশেই আমি একদিন থাকব | 

তার পরের আরো অনেক জন্মদিনের কথাও মনে পড়ে | তার পরের বছর পিসিমনির কাছ থেকে অরিগামির বই পাই একটা |  আমরা যদিও তখন এলাহাবাদে চলে এসেছি, আমার জন্মদিন টা অনেক বছরেই পুজোর সময়ে পড়ত বলে হুগলি চলে আসা হত সেই সময়ে | এমন কি পুজোর জামার সঙ্গে একটা জন্মদিনের জামাও জুটে যেত প্রতিবছর | যে বছর জন্মদিন টা পুজোর ছুটির মধ্যে পড়তনা, বা শনি-রবি পড়তনা, সে বছর স্কুলে নতুন জামা পরে যেতাম আর সবাইকে লজেন্স বিলি করতাম | অবশ্য সেরকম আমি মোটে দুবছর করেছি বলেই আমার মনে পড়ে | জন্মদিনে বাড়িতে কেক কেটে পার্টি খুব একটা হতনা আমার জন্মদিনে, তবে মা কেক করত, আর পায়েস করত | দুঃখের বিষয় হলো মা সে পায়েস টা  আজও করেছে বলে জানা গেল, কিন্তু আমি খেতে পেলামনা | 

জন্মদিনের উপহার টা সাধারণত ভোরবেলা আমি ঘুম থেকে ওঠার আগে বিছানার মধ্যে গুঁজে রাখত মা | সকালে উঠে কত কি যে পেয়েছি বিছানার মধ্যে! কারুকার্য করা হাতল ওয়ালা বাঁকানো ছোরা থেকে শুরু করে সেলিম আলীর The Book of Indian Birds সবই এভাবে পাওয়া | বোন কার্ড এঁকে দিত, কখনো কখনো অন্য কিছু উপহারও দিত |

কলেজে পড়বার সময়ে জন্মদিনে বন্ধুবান্ধবদের হোটেলে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতাম | হোস্টেলে কারুর জন্মদিন থাকলে রাত বারোটা বাজতে না বাজতেই যা অত্যাচার করা হত মেরে ধরে কেক মাখিয়ে যে আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে আমি হোস্টেলে থাকিনি | এই কেক মাখানোর ব্যাপারটা আমার ভয়ানক অপছন্দ - আর সত্যিকারের অপছন্দ | এটা আমি চাকরি করবার সময়ে অফিসেও হতে দেখেছি | একে তো ছোটবেলা থেকেই খাবার জিনিস নষ্ট করা আমার সহ্য হয়না (সেটা আমার চেহারা দেখলেই আন্দাজ করা যায়) আর তার ওপর ওই কেকের ক্রিম জিনিসটা এমনি যে মুখে বা চুলে মাখালে সেটা তুলতে বেশ কষ্ট হয় |  অবশ্য আমি বরাবরই এই অত্যাচারটির থেকে বেঁচে গিয়েছি |

আমেরিকায় এসে প্রথম বছর আমার জন্মদিনে নিউ ইয়র্কে লায়ন কিং ব্রডওয়ে মিউসিকালটি দেখতে গিয়েছিলাম | সারা রাত জেগে হোমওয়ার্ক শেষ করে তারপর জন্মদিনের দিন সন্ধ্যেবেলা ক্লাস কামাই করে নিউ ইয়র্ক যাই ও নাটক দেখে অনেক রাতে ফিরি | তার পরের বছর আমি নিজের জন্য আমার ডিজিটাল এস এল আর ক্যামেরাটি কিনি, যেটা আমার বহুদিনের শখ ছিল | ২০১০ সালে কলেজে গরবা নাইট ছিল, আর তার পরের দিন বনে-জঙ্গলে পাতায় পাতায় রঙের খেলা দেখতে কানেকটিকাট গিয়েছিলাম | তারও পরের দিন নিউ ইয়র্কের দুর্গাপুজো | কাজেই এটা বলা চলে যে এ দেশে আসার পর থেকে আমার জন্মদিনগুলো অনেক বেশি ঘটনাবহুল হয়ে পড়েছে |

এ বছর অবশ্য সেরকম কিছুই হওয়ার কথা ছিলনা | গরবা নাইট গত শুক্রবার হয়ে গেছে | দুর্গাপুজো শেষ, পাতার রং দেখতে যাওয়া সামনের শনিবার | সুমনার বাবা আসছেন দেশ থেকে, তাই ও সঙ্গ দিতে পারবেনা জানালো | আমি ভেবেছিলাম বাড়িতে বসে কাজ করব | অর্থাত কিনা খানিকটা এইরকম :


কিন্তু আত্রেয়ী, সুমনা আর মালা যে আমায় চমকে দিয়ে কাল রাত্রে সারপ্রাইজ পার্টি রেখেছে কে জানত? সেই সঙ্গে নতুন জামা-কাপড়, অনন্যার দেওয়া নতুন জামা, মাঝরাত্রে Indiana Jones and the Last Crusade দেখতে দেখতে মাফিন কেটে খাওয়া - আর তারপর সক্কাল সক্কাল উঠে কুন্তলার এই শুভেচ্ছা - সব মিলিয়ে এই জন্মদিনটাও বেশ স্মরণীয় হয়ে রইল | আর তারপর আত্রেয়ীর বাড়িতে তিন বেলা নেমন্তন্ন তো ছিলই | ও হ্যাঁ, নেমন্তন্নে পায়েসও ছিল |

দুঃখ একটাই  - বয়েসটা তিরিশ পেরিয়ে গেল | সেই হযবরল'র দেশ হলে নাহয় একটা আশা থাকত যে চল্লিশ অবধি উঠলে আবার কমানো যাবে বয়েস, এখানে তো তাও নেই | নিজেকে বুড়ো-বুড়ো মনে হওয়ার রোগটা আমার কিছুদিন ধরেই আছে, আগে তাও নিজেকে কুড়ির কোঠায় বলে সান্ত্বনা দেওয়া যেত | এবার থেকে তাও যাবেনা | তবে তার বদলে যদি উপহার পাওয়া যায় আর কেক খাওয়া যায় তাহলে মন্দ কি?



3 comments:

atreyee said...

Shubho jonmodin sugata da. tobe ato dukho kano tomar! ami to sara bochor dhore bhabi kobe abar jonmodin asbe, r jommer cake-tek khabo!

comic 2to mojar.

Kuntala said...

আমি যদিও হোস্টেলে থাকতাম, তবু আমাকে কোনদিন কেউ কেক মাখানোর চেষ্টা করেনি। ফলাফলটা আন্দাজ করতে পারত বলেই বোধহয়। তিরিশ পেরিয়েছেন বলে দুঃখ করবেন না। জীবনের ভাল ভাল জিনিস সব এখনি শুরু হবে, দেখবেন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা রইল।

bhut said...

belated [appropriate bangla khuje pelam na] Shubho jonmodin.. besh ghotonabohul jonmodin hoeche to !! amader hostel eo oi muffin type cake er opor gems diye decorate kore jonmodin palon hoto [otai store e pawa jeto kina]... kajei bujhtei parcho cake makahnor kono chance chhilo na..